মাত্র ২০ ডলারের ঘড়ি কীভাবে রোলেক্স'কেও ছড়িয়ে গেলো?

আমরা সাধারণত ভাবি, কোনো একটা প্রোডাক্ট বা ব্যবসাকে সফল করতে হলে তাতে দুনিয়ার সব অত্যাধুনিক ফিচার যোগ করতে হবে। ডিজাইন হতে হবে চোখধাঁধানো, আর দাম হতে হবে এমন যেন তা একটা স্ট্যাটাস সিম্বল হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যদি বলি, পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে সফল, সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ঘড়িটার দাম মাত্র বিশ ডলার? হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। মাত্র বিশ ডলারের একটা সাধারণ প্লাস্টিকের ঘড়ি, যা ওজনে তিনটে কয়েনের সমান, কিন্তু বিক্রি আর জনপ্রিয়তার দিক থেকে সব নামিদামি লাক্সারি ব্র্যান্ডকে পেছনে ফেলেছে। 

আমরা কথা বলছি ক্যাসিও এফ-৯১ডব্লিউ (Casio FW) নিয়ে। 

এটি শুধু একটা সস্তা ডিজিটাল ঘড়ি নয় গত পঞ্চাশ বছরের প্রোডাক্ট ডিজাইনের সবচেয়ে নিখুঁত উদাহরণ। যারা নতুন ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছেন বা নতুন পণ্য বাজারে আনার কথা ভাবছেন, তাদের জন্য এই বিশ ডলারের ঘড়ির পেছনের গল্পটা একটা মাস্টারক্লাস।

গল্পটা বুঝতে একটু অতীতে ফিরে যাই। ষাট বা সত্তরের দশকের দিকে ঘড়ি বলতে মানুষ বুঝত স্প্রিং আর ছোট ছোট গিয়ারে ঠাসা এমন এক মেকানিক্যাল যন্ত্র, যা ছিল অত্যন্ত দামি, ভঙ্গুর এবং বর্তমান মানদণ্ডে বেশ ভুল সময় দিত। এরপর ১৯৬৯ সালে সেকো যখন প্রথম ব্যাটারিচালিত কোয়ার্টজ ঘড়ি বাজারে আনল, তখন সুইস ঘড়ি নির্মাতারা একে পাত্তাই দেয়নি। এই একটা ভুল হিসাব পুরো সুইস ঘড়ি শিল্পকে প্রায় ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। ঠিক এই সুযোগেই প্রবেশ করে ক্যাসিও। 

মজার ব্যাপার হলো, ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ক্যাসিও কিন্তু কোনো ঘড়ির কোম্পানি ছিল না, তারা মূলত ক্যালকুলেটর বানাত। তারা ছোট আকারের ডিজিটাল ডিসপ্লে তৈরিতে বেশ দক্ষ ছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, ঘড়ি যদি আর মেকানিক্যাল যন্ত্র না থেকে ইলেকট্রনিক ডিভাইসে পরিণত হয়, তবে প্রথাগত ঘড়ি নির্মাতাদের চেয়ে তাদের সুবিধা অনেক বেশি।

প্রথমদিকে ক্যাসিও-ও কিন্তু অন্যান্যদের মতো একই ভুল করেছিল।

তারা ঘড়ির ভেতরে ক্যালকুলেটর, গেম, থার্মোমিটার, এমনকি ফোন নম্বর সেভ করে রাখার ফিচার ঢোকাতে শুরু করেছিল। তারা ঘড়িকে একটা বিলাসবহুল কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক্স হিসেবেই দেখছিল। 

কিন্তু আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে তারা একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করল। বাজারে যখন অসংখ্য ফিচারে ঠাসা জটিল সব ঘড়ির ছড়াছড়ি, ঠিক তখনই ক্যাসিওর একদম সাধারণ মডেলগুলো সবচেয়ে বেশি বিক্রি হতে শুরু করল। মানুষ আসলে এমন কোনো ঘড়ি চাইছিল না, যেটা দিয়ে কফি বানানো ছাড়া বাকি সব করা যায়। তারা শুধু এমন একটা যন্ত্র চাইছিল, যা নিখুঁতভাবে সময় জানাবে, সহজে নষ্ট হবে না, ঘন ঘন ব্যাটারি বদলাতে হবে না এবং যার দাম হবে একেবারে হাতের নাগালে।

এই অসাধারণ উপলব্ধি থেকেই ১৯৮৯ সালে বিশ্ববাজারে আসে ক্যাসিও এফ-৯১ডব্লিউ। কাগজে-কলমে এই ঘড়িতে যুগান্তকারী কিছুই ছিল না। একটা স্টপওয়াচ, একটা অ্যালার্ম, একটা ক্যালেন্ডার আর একটা ব্যাকলাইট, ব্যাস, এইটুকুই। কোনো ক্যালকুলেটর নেই, কোনো গেম নেই। কিন্তু যেটুকু আছে, তা সবচেয়ে নিখুঁতভাবে তৈরি। ঘড়িটি মাসে মাত্র ৩০ সেকেন্ড এদিক-ওদিক হতো আর এর একটা ব্যাটারি অনায়াসে সাত বছর চলে যেত। এর ডিজাইন ছিল এতটাই সাধারণ আর ছিমছাম যে, এটা কারো হাতে থাকলে আলাদা করে চোখেই পড়ত না। 

ডিজাইনের দুনিয়ায় একটা খুব বিখ্যাত কথা আছে। 

কোনো কিছুর ডিজাইন তখন সম্পূর্ণ হয় না যখন তাতে আর কিছু যোগ করার বাকি থাকে না বরং তখন সম্পূর্ণ হয়, যখন সেখান থেকে আর কোনো কিছু বাদ দেওয়ার উপায় থাকে না। ক্যাসিও ঠিক এই কাজটাই করেছিল।

খুব কম দামে এত দুর্দান্ত একটা জিনিস বাজারে আসায় যা হওয়ার তাই হলো। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ক্যাসিও বছরে লাখ লাখ পিস তৈরি করতে শুরু করল। এটি এতটাই সহজলভ্য আর নির্ভরযোগ্য ছিল যে, একসময় আল-kয়েদার মতো গোষ্ঠীগুলোও তাদের টাইমিং ডিভাইস হিসেবে এই ঘড়ি ব্যবহার করতে শুরু করে। 

তবে এই বিতর্কিত অধ্যায়টি একটা বড় সত্যকে সামনে নিয়ে আসে, পণ্য হিসেবে এটি কতটা সর্বজনীন হয়ে উঠেছিল। এটি শুধুই একটা ঘড়ি ছিল, যার কোনো নির্দিষ্ট নিজস্বতা বা অহংকার ছিল না, ছিল কেবল শতভাগ উপযোগিতা।

আজকের দিনের স্মার্টওয়াচগুলোর দিকে একবার তাকান। 

এগুলো তিন বছরের মাথাতেই পুরনো হয়ে যায়, নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট দিতে হয় এবং প্রতিদিন রাতে চার্জে বসাতে হয়। অথচ ১৯৮৯ সালে তৈরি একটা ক্যাসিও ঘড়ি আর গত সপ্তাহে তৈরি হওয়া একটা ক্যাসিও ঘড়ির মধ্যে কার্যকারিতায় কোনো পার্থক্য নেই। 

বর্তমান বিশ্বে যেখানে কোম্পানিগুলো ইচ্ছে করেই তাদের পণ্য এমনভাবে বানায় যেন কয়েক বছর পর মানুষ নতুন মডেল কিনতে বাধ্য হয়, সেখানে ক্যাসিও উল্টো পথে হেঁটেছে। তারা প্রমাণ করেছে যে, কোনো পণ্যকে সফল হতে হলে তাতে দামি ম্যাটেরিয়াল বা হাজারটা ফিচারের দরকার নেই। 

ক্যাসিওর এই ছোট্ট ঘড়িটি আজ কেবল সময় দেখার যন্ত্র নয়, এটি এক ধরনের বস্তুবাদ-বিরোধী আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়ীদের জন্য এর চেয়ে বড় শিক্ষা আর কী হতে পারে! আপনি যদি মানুষের কোনো একটা বাস্তব সমস্যার একদম সহজ, টেকসই এবং সাশ্রয়ী সমাধান বের করতে পারেন, তবে আপনার পণ্যের প্রচারের জন্য কোনো কৃত্রিম হাইপ তোলার দরকার হবে না। পণ্যের গুণগত মান আর মানুষের মুখের কথাই আপনার ব্র্যান্ডকে দশকের পর দশক ধরে বাঁচিয়ে রাখবে।

No comments:

Post a Comment

মাত্র ২০ ডলারের ঘড়ি কীভাবে রোলেক্স'কেও ছড়িয়ে গেলো?

আমরা সাধারণত ভাবি, কোনো একটা প্রোডাক্ট বা ব্যবসাকে সফল করতে হলে তাতে দুনিয়ার সব অত্যাধুনিক ফিচার যোগ করতে হবে। ডিজাইন হতে হবে চোখধাঁধানো, আর...