জাপানের বাইরে সবচেয়ে বেশি জাপানি কেন ব্রাজিলে? ১০০ বছরের অবিশ্বাস্য গল্প!

 জাপানের বাইরে সবচেয়ে বেশি জাপানি কোথায় থাকে?


অনেকেই বলবে, আমেরিকা। কেউ বলবে, কানাডা। আরেকটু জ্ঞানী হলে বলতে পারে- হাওয়াই!


কিন্তু সত্যিটা হলো—ব্রাজিল


শুনতে অদ্ভুত লাগে, তাই না? জাপানের উল্টো দিকের দেশ ব্রাজিল। মাঝখানে বিশাল প্রশান্ত মহাসাগর। 


অথচ সেখানেই এখন প্রায় বিশ লাখ জাপানি বংশোদ্ভূত মানুষ থাকে। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এত বেশি জাপানি নেই, এক জাপান ছাড়া।


কীভাবে গেল ওরা? কেন গেল? 


সময়টা ১৯০৮ সাল।


জাপানে অর্থনৈতিক অবস্থা তখন বেশ খারাপ। খাওয়ার মানুষ বেশি, চাষের জমি কম। যারা চাষাবাদ করতেন, তাদের পরিস্থিতি কঠিন। ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নেই।


ওদিকে ব্রাজিল বিশাল এক দেশ। জমির শেষ নেই। কফির বাগানের জন্য দরকার হাজার হাজার শ্রমিক। 


তখন দাসপ্রথা শেষ হয়ে গেছে। আফ্রিকা থেকে লোক আনা যাচ্ছে না। 


ইতালিয়ানরা তখনকার বড় শ্রমিক গোষ্ঠী ছিল ব্রাজিলে। উনিশ শতকের শেষের দিকে কয়েক লাখ ইতালিয়ান কফি বাগানে কাজ করতে যায়। 


কিন্তু ১৯০২ সালে ইতালি সরকার এক বিশেষ আইন জারি করে ব্রাজিলে শ্রমিক অভিবাসন নিষিদ্ধ করে দেয়। 


কারণ ব্রাজিলের কফি বাগানে ইতালিয়ান শ্রমিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও দাসসদৃশ অবস্থার খবর ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল।


যার ফলে ইতালি থেকে নতুন শ্রমিক আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ঠিক এই শূন্যস্থান পূরণ করতেই ব্রাজিল জাপানের দিকে তাকায়। 


জাপান সরকারও এতে রাজি হয়। তাদের ভাবনা ছিল, "আমাদের কৃষকেরা যাবে। কাজ করবে। টাকা জমিয়ে ফিরে আসবে।"


এভাবেই ১৯০৮ সালে ‘কাসাতো মারু’ নামের এক জাহাজ সাতশোরও বেশি জাপানি নিয়ে ব্রাজিলের পথে রওনা দিল। এদের বেশিরভাগই ছিল কৃষক। পরনে জাপানি পোশাক। মনে স্বপ্ন—পাঁচ-ছয় বছর খেটেখুটে আবার দেশে ফিরবে। 


জাহাজ থেকে নেমেই তারা পড়ে বিপদে।


একে তো তারা ভাষা বোঝে না। পর্তুগিজ ভাষা ওদের কাছে মনে হতো, কেউ খুব জোরে গান গাইছে। একটা শব্দও তাদের মাথায় ঢোকে না।


আবার খাবার চিনতে পারে না। জাপানে ওরা ভাত খায়, মাছ খায়, সয়া সস দেয়। আর এখানে এত বড় বড় গরুর মাংসের টুকরা পুড়িয়ে একজন লোক খেয়ে ফেলে! 


কফি বাগানের কাজটাও প্রচণ্ড কষ্টের। সকাল থেকে সন্ধ্যা রোদে দাঁড়িয়ে কফি ফল তোলা লাগে। হাতে ফোসকা পড়ে, শরীর খারাপ হয়। অনেকে পালানোর চেষ্টা করে। অনেকে অসুস্থ হয়ে মারা যায়।


কিন্তু জাপানিরা সহজে হার মানে না। ওরা বুঝতে পারে, শুধু শ্রমিক হয়ে থাকলে হবে না। নিজেদের কিছু করতে হবে।


তাই অল্প অল্প করে জমি লিজ নেওয়া শুরু করে। তারপর নিজেরাই চাষ করে।


জাপানিরা ছোট জমি থেকেও বেশি ফলন বের করতে পারে। এটা ওদের পুরোনো অভ্যাস। ওরা শুধু কফি না, সবজি চাষ শুরু করল। স্ট্রবেরি, টমেটো, আলু, চা, পার্সিমন—এমন সব জিনিস আনল, যেগুলো ব্রাজিলে আগে তেমন কেউ চাষ করত না।


ব্রাজিলের মানুষ তো অবাক। ওরা বলত, "এই জাপানিরা জমির সাথে এমনভাবে কথা বলে, যেন জমিটা ওদের পরিবারের কেউ।"


কয়েক বছরের মধ্যে সাও পাওলো শহরের আশপাশের সবজির বাজার জাপানিদের হাতে চলে গেল। তারপর ধীরে ধীরে ওরা শহরে আসতে লাগল। 


কেউ দোকান দিল। কেউ দিল কাপড়ের ব্যবসা। কেউ বড় অফিসে চাকরি নিল। কেউ ডাক্তার হলো, ইঞ্জিনিয়ার হলো, শিক্ষক হলো।


আজ ব্রাজিলের বহু নামী চিকিৎসক, অধ্যাপক, বিজ্ঞানী, এমনকি সরকারি কর্মকর্তাও জাপানি বংশোদ্ভূত। যে মানুষগুলো একদিন কফি বাগানে ঘাম ঝরিয়েছিল, তাদের নাতিরা এখন বিশ্ববিদ্যালয় চালায়।


তবে একটা জিনিস ওরা কোনোদিন ছাড়েনি—বাড়িতে ঢুকে গেলে ওরা এখনো 'জাপানি' হয়ে যায়।


বেশিরভাগ পরিবারে এখনো ভাত, মিসো স্যুপ, সুশি রান্না হয়। দাদু-দাদিরা জাপানি ভাষায় কথা বলেন। নাতিরা উত্তর দেয় পর্তুগিজে। দুজনেই একে অপরকে বোঝে। 


এটা দেখে ভাষাবিদরা অবাক হয়ে যান। আর দাদুরা বলেন, "বাচ্চাটা একটু অলস, তাই জাপানি শেখে না।"


কিন্তু ঘরের বাইরে ওরা পুরো ব্রাজিলিয়ান। বারবিকিউ খায়, ফুটবল দেখে, কার্নিভালে নাচে। ফুটবল তো ওদের রক্তে মিশে গেছে। 


মজার ব্যাপার হলো, ওরা জাপানি সুশিও খায়, আবার গরুর মাংসের চুরাসকোও খায়। ওদের সুশিতে নাকি কখনো ক্রিম চিজও থাকে। 


জাপানের মানুষ এটা দেখে প্রথমে হাসে, পরে খেয়ে দেখলে চুপ হয়ে যায়। জিহবার স্বাদ আসলে কোনো সীমানা মানে না।


১৯৯০ সালের দিকে জাপানে কারখানা বেড়ে গেল। গাড়ি, ইলেকট্রনিকস—সব জায়গায় শ্রমিক দরকার। কিন্তু জাপানের নিজের লোক কম।


জাপান সরকার এক বুদ্ধি বের করল। বলল, "যাদের পূর্বপুরুষ জাপানি, তারা চাইলে এসে কাজ করতে পারবে।"


খবরটা ব্রাজিলের জাপানি পরিবারগুলোতে ছড়িয়ে পড়ল। দাদু একশো বছর আগে কাজের জন্য ব্রাজিলে গিয়েছিলেন। এখন নাতি কাজের জন্য জাপানে ফিরবে! ইতিহাস যেন গোল হয়ে ঘুরে।


হাজার হাজার তরুণ-তরুণী জাপানে ফিরে গেল। ওরা গাড়ি কারখানায় কাজ নিল, ইলেকট্রনিকস ফ্যাক্টরিতে কাজ নিল। 


কেউ বড় অফিসে চাকরি পেল, কেউ নিজের ব্যবসা খুলল। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেল, পরে শিক্ষক বা প্রকৌশলী হয়ে গেল।


© Collected

No comments:

Post a Comment

জাপানের বাইরে সবচেয়ে বেশি জাপানি কেন ব্রাজিলে? ১০০ বছরের অবিশ্বাস্য গল্প!

  জাপানের বাইরে সবচেয়ে বেশি জাপানি কোথায় থাকে? অনেকেই বলবে, আমেরিকা। কেউ বলবে, কানাডা। আরেকটু জ্ঞানী হলে বলতে পারে- হাওয়াই!