বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা মাত্র ১ ডিগ্রি বাড়লেই বাতাসের পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ে ৭ শতাংশ, নেপালের সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা কি আমাদেরই ডেকে আনা বিপর্যয়? আর আমাদের এই রেনিউয়েবল এনার্জি ও প্রযুক্তি কি পারবে গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের এই দ্রুত ধ্বংসযজ্ঞ থামাতে, নাকি প্রতিক্রিয়া জানাতে অনেক দেরি হয়ে গেছে?
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তর এবং সার্কুলার এনার্জি সিস্টেমের বাস্তবায়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক গবেষণা চলছে। নীতিগত সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক সংস্কার এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় কীভাবে একটি অঞ্চলকে শূন্য-নির্গমন (Zero-emission) ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়ার ল্যাঙ্কাস্টার শহর সোলার পারমিটের সময়সীমা ৬ মাস থেকে কমিয়ে ৪৫ মিনিটে এনে বেকারত্ব ১৭% থেকে ৬%-এ নামিয়েছে, । নরওয়ের ওসলো ২০৩০ সালের মধ্যে প্রথম শূন্য-নির্গমন শহর হওয়ার লক্ষ্যে ভবনের উপাদান আপসাইক্লিং করছে এবং ট্রন্ডহেইমের Powerhouse ভবন নিজের চাহিদার দ্বিগুণ (বার্ষিক ৫০০, ০০০ kWh) সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, । পাশাপাশি, উত্তর সাগরে ৭৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ Viking Link সাবসি কেবলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক গ্রিড কানেক্টিভিটি এবং সিঙ্গাপুরের জৈব প্রযুক্তিতে (কমলার খোসা ও ব্যাকটেরিয়া) ব্যাটারি রিসাইক্লিং মেটেরিয়াল সায়েন্সের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, ।
তবে গবেষণার বস্তুনিষ্ঠতা কেবল এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি উদযাপনে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না বরং এর বিপরীতে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের (Global Warming) যে ভয়াবহ ডার্ক সাইড বা অন্ধকার দিক উন্মোচিত হচ্ছে, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। আইপিসিসি (IPCC)-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিল্পবিপ্লব-পূর্ব যুগের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই প্রায় ১. ১° সেলসিয়াস বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরম বৈরী ভাবাপন্নতার প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে বৃদ্ধি পাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগে।
সম্প্রতি আমাদের প্রতিবেশী দেশ নেপালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা (Flash Flood) ও ভূমিধস কোনো বিচ্ছিন্ন আঞ্চলিক ঘটনা নয়, এটি মূলত দক্ষিণ এশীয় মৌসুমি বায়ুর ধরণ পরিবর্তন এবং হিমালয়ীয় গ্লেসিয়ার মেল্টিং-এর একটি প্রত্যক্ষ বৈজ্ঞানিক ফলাফল। বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা প্রতি ১° সেলসিয়াস বৃদ্ধিতে বাতাস প্রায় ৭% বেশি জলীয় বাষ্প ধরে রাখতে পারে (Clausius-Clapeyron Relation)। এর ফলে হিমালয় পাদদেশে স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত বা মেঘভাঙা বৃষ্টি (Cloudburst) ঘটছে। উচ্চ তাপমাত্রায় হিমবাহ গলে তৈরি হওয়া হিমবাহ হ্রদগুলোর বাঁধ ভেঙে (GLOF Glacial Lake Outburst Flood) পলল সংমিশ্রিত পানি নিমেষেই ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সমতলের লোকালয়।
কেবল নেপাল নয়, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের এই প্রভাবে বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হার ও তীব্রতা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে
চরম দাবানল ও খরা,শুষ্ক অঞ্চলের আর্দ্রতা দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে বনভূমিতে তৈরি করছে টিন্ডারবক্স প্রভাব, যার ফলে আমাজন থেকে কানাডা পর্যন্ত নজিরবিহীন দাবানল সৃষ্টি হচ্ছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অ্যান্টার্কটিকা ও গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল সহ বিশ্বের নিচু দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর অস্তিত্ব বিলোপের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা (Rapid Intensification), মহাসাগরের উপরিভাগের তাপমাত্রা ২৬. ৫° সেলসিয়াসের বেশি হওয়ায় ঘূর্ণিঝড়গুলো অল্প সময়ে প্রচণ্ড শক্তিশালী ক্যাটাগরি ৪ বা ৫ ঝড়ে রূপ নিচ্ছে।
ব্যবসায়িক অর্থনীতি ও ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার ঝুঁকি:
জলবায়ু পরিবর্তনের এই ত্বরান্বিত হার কেবল পরিবেশেরই ক্ষতি করছে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক কাঠামোর জন্য তৈরি করছে অভূতপূর্ব ঝুঁকি এবং নতুন সম্ভাবনা:
ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (IEA)-র প্রাক্কলন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ক্লিন এনার্জি ও গ্রিন টেকনোলজির বার্ষিক বিনিয়োগ ইতিমধ্যেই ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে গ্লোবাল ক্লাইমেট টেক মেগাট্রেন্ড বহু ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়িক বাজারে রূপ নেবে, যা প্রথাগত জ্বালানি ব্যবসার স্থান দখল করছে।
সামগ্রিক জিডিপি ও সাপ্লাই চেইনের ক্ষয়ক্ষতি,ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরাম (WEF)-এর গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্ট অনুযায়ী, জলবায়ু অভিযোজন না করা হলে ২০৫০ সালের মধ্যে চরম আবহাওয়া সংক্রান্ত দুর্যোগের কারণে বৈশ্বিক জিডিপি (GDP) প্রায় ৪% থেকে ১৮% পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। ডিরেক্ট সাপ্লাই চেইন ব্যাঘাত, লজিস্টিকস জ্যাম এবং সম্পদহানির কারণে বিশ্ব বাণিজ্য অবকাঠামো চরম ক্ষতির মুখোমুখি।
ESG ও আর্থিক ক্যাপিটাল প্রবাহ,বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে বিনিয়োগকারীরা প্রতিষ্ঠানগুলোর ESG (Environmental, Social and Governance) কমপ্লায়েন্স কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যে ব্যবসাগুলো কার্বন নির্গমন কমাতে ব্যর্থ হচ্ছে, তারা ব্যাঙ্ক ঋণ, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফাণ্ডিং এবং গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে আস্থা হারাচ্ছে।
বীমা খাতের বিপর্যয় (Insurance Disruption),জলবায়ু সংক্রান্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক বীমা কোম্পানিগুলো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে ইনস্যুরেন্স কভারেজ দেওয়া বন্ধ করছে কিংবা প্রিমিয়াম বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা রিয়েল এস্টেট ও কমার্শিয়াল সেক্টরের পরিচালন ব্যয় মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
একদিকে যখন কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষণ (Artificial Photosynthesis) ও গ্রিন হাইড্রোজেনের মাধ্যমে ২০৫০ সালের মধ্যে ১০ বিলিয়ন মানুষের শক্তি চাহিদা মেটানোর পরিকল্পনা চলছে, অন্যদিকে প্রকৃতির প্রতিক্রিয়া জানানোর গতি আমাদের প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক অভিযোজনের চেয়ে বহুগুণ দ্রুত প্রমাণিত হচ্ছে।
এছাড়া নেপালের বন্যা আমাদের কঠোর বার্তা দেয়, জলবায়ু রূপান্তর কেবল একটি প্রযুক্তিগত বিকল্প নয়, এটি মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার এক দৌড়, যেখানে আমাদের হাতে সময় অত্যন্ত সীমিত।
No comments:
Post a Comment