দামি ঘড়ি নয়, আত্মবিশ্বাসই আসল আভিজাত্য

 বিল গেটসের সম্পত্তির পরিমাণ একশ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। অথচ তাঁর হাতের ঘড়িটির দাম মাত্র সত্তর ডলার। এত সাধারণ ঘড়ি পরার জন্য তিনি কখনোই কুণ্ঠাবোধ করেননি।


ব্যাপারটা অনেকের কাছে বেশ অবাক করার মতো। কারণ সমাজে এমন অনেকেই আছেন যারা পনেরো হাজার ডলার দিয়ে ঘড়ি কেনেন নিজেদের জাহির করতে।


কিন্তু বিল গেটসের মতো মানুষ কেন এমন সস্তা ঘড়ি পরেন, সেই প্রশ্নটা আসলে একটু অন্যভাবে ভাবা দরকার।


প্রশ্নটা এটা নয় যে তিনি দামি ঘড়ি কিনতে পারেন কি না। বরং প্রশ্নটা হলো, কেন তিনি এমন জিনিসের প্রয়োজন অনুভব করলেন না। উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা আরও কয়েকজন বিখ্যাত মানুষের দেখা পাব। যাদের মধ্যে আছেন একজন বিলিয়নেয়ার, একজন পোপ এবং এফবিআই-এর সাবেক ডিরেক্টর।


চলুন প্রথমে চাক ফিনির গল্পটা জেনে নেওয়া যাক। তিনি ডিউটি-ফ্রি শপার্স নামের বিশাল এক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।


আশির দশকে তিনি ছিলেন আমেরিকার অন্যতম শীর্ষ ধনী ব্যক্তি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়েও তিনি তখন বেশি ধনী ছিলেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তিনি গোপনে তার প্রায় সব সম্পদ দান করে দিচ্ছিলেন।


জীবদ্দশায় তিনি প্রায় আট বিলিয়ন ডলার সমাজকল্যাণে দান করে গেছেন। এত বিশাল সম্পত্তির মালিকের হাতে থাকত পনেরো ডলারের ক্যাসিও এফ-৯১ডব্লিউ ঘড়ি। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি বলেছিলেন, পনেরো ডলারের ঘড়ি যদি নিখুঁত সময় জানায়, তবে রোলেক্স পরার মানে নেই। তাঁর কাছে ঘড়ি শুধু সময় দেখার যন্ত্র।


মৃত্যুর সময় তাঁর নামে মাত্র দুই মিলিয়ন ডলার অবশিষ্ট ছিল আর হাতে ছিল সেই সস্তা ক্যাসিও ঘড়িটি।


এবার আবার বিল গেটসের কথায় ফেরা যাক। তাকে বারবার দেখা গেছে সত্তর ডলারের সাধারণ ক্যাসিও ডুরো ঘড়ি পরতে।


একবার এক কনফারেন্সে তিনি একটি দামি ঘড়ি পরলেও সেটি একজন দর্শককে উপহার দিয়ে দেন। এরপর তিনি আবার নিজের সেই সস্তা ঘড়িতেই ফিরে যান। যিনি দামি ঘড়িটি বিলিয়ে দিয়ে সস্তা ঘড়িটা রেখে দেন, তিনি মানুষকে দেখানোর জন্য এমনটা করছেন না। তিনি বুঝে গেছেন ঘড়ির আসল কাজটা কী।


যাদের নিজেদের নিয়ে কিছু প্রমাণের তাগিদ থাকে না, তারাই মূলত এমন মানসিকতায় পৌঁছাতে পারেন। যারা নতুন বড়লোক হন, তারা দামি জিনিস কিনে অবস্থান জাহির করতে চান। কিন্তু যারা সত্যিকার অর্থেই সফল, তাদের এই প্রমাণের দরকার পড়ে না।


আপনি কোন ঘরে আছেন, সেটা প্রমাণের জন্য হাতের ঘড়ির কোনো প্রয়োজন নেই।


বারাক ওবামাও প্রেসিডেন্ট হওয়ার অনেক আগে থেকেই সাধারণ ক্যাসিও ঘড়ি পরতেন। যখন তার দিকে পৃথিবীর কোনো নজর ছিল না, তখন এটাই ছিল তার পছন্দ।


পোপ ফ্রান্সিসের হাতেও দেখা যায় ক্যাসিও এমকিউ-২৪ মডেলের সাদামাটা একটি ঘড়ি। ভ্যাটিকানের প্রধান চাইলে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ঘড়িটি পরতে পারতেন। কিন্তু তিনি একটা সাধারণ রেস্টুরেন্টের খাবারের চেয়েও সস্তা ঘড়ি বেছে নিয়েছেন। এফবিআই-এর সাবেক ডিরেক্টর রবার্ট মুলারকেও ক্যাসিও ঘড়ি পরতে দেখা গেছে।


যারা নিজেদের কাজের মাধ্যমে বিশাল কিছু তৈরি করেছেন, তাদের অন্য বস্তুর মাধ্যমে নিজেদের বড় প্রমাণ করতে হয় না। বিলাসবহুল ঘড়ির বাজারগুলো মূলত মানুষের এক ধরনের মানসিক উদ্বেগের ওপর নির্ভর করে টিকে আছে।


তারা বোঝাতে চায় যে, সঠিক ঘড়িটা না পরলে কেউ আপনাকে সম্মান করবে না। ঘড়ি কোম্পানিগুলো মার্কেটিংয়ের পেছনে প্রচুর টাকা খরচ করে। যিনি দামি ঘড়ি কিনছেন, তিনি আসলে সেই ক্যাম্পেইনের খরচটাও দিচ্ছেন।


কিন্তু আমাদের গল্পের এই সফল মানুষেরা অনেক আগেই এই সামাজিক উদ্বেগ থেকে মুক্ত হয়ে গেছেন।


এবার ক্যাসিও ঘড়ির পেছনের কারিগরি দিকটা দেখা যাক। ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানির মূল দর্শনই ছিল সমস্যার বাস্তব সমাধান দেওয়া। দশ হাজার ডলার দামের মেকানিক্যাল ঘড়ির চেয়েও এটি বেশি নিখুঁত সময় দেয়। ক্যাসিও তাদের ঘড়ির পার্টস নিজেরাই তৈরি করে মান ধরে রাখে।


সত্তর ডলার দামের ক্যাসিও ডুরো ঘড়িটি ডাইভিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চমানের সার্টিফিকেশন পেয়েছে। অথচ একই সার্টিফিকেশন পাওয়া সুইস ঘড়িগুলোর দাম প্রায় তিরিশ গুণ বেশি।


কাজের দিক দিয়ে দুই হাজার ডলারের ঘড়ি আর সত্তর ডলারের ক্যাসিওর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। দামের এই বিশাল পার্থক্য শুধু ব্র্যান্ডের নাম আর কৃত্রিম আভিজাত্যের কারণে। বিল গেটস ঘড়িটা দেখানোর জন্য কেনেননি, নিখুঁত কাজের জন্যই কিনেছেন।


মজার তথ্য হলো, গুয়ানতানামো বে-তে বন্দীদের হাতে প্রচুর ক্যাসিও ঘড়ি পাওয়া যায়। নিখুঁত বলে আল কায়েদার ট্রেনিং ক্যাম্পে এটি দেওয়া হতো। অথচ ঠিক একই সময়ে এই ঘড়িটিই পরা ছিল তরুণ বারাক ওবামার হাতে। গুয়ানতানামোর বন্দী আর মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে একই ঘড়ি!


আসলে এই ঘড়িটি কারো কাছে কোনো প্রশ্ন করে না বা বিচার করে না।


কে কী কাজে এটি ব্যবহার করবে, তা নিয়ে এর মাথাব্যথা নেই। এটি কোনো ফ্যাশন বা স্ট্যাটাসের প্রতীক নয়, নিতান্তই একটা দরকারি জিনিস।


ধর্ম, বর্ণ, ধনী-গরিব, সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে ক্যাসিও ঘড়ি শুধু তার আসল কাজটাই করে যায়। কোম্পানিটি কখনোই বিলিয়নেয়ারদের টার্গেট করে বিজ্ঞাপন বানায়নি। তারা শুধু এমন জিনিস বানিয়েছে যেটা নিখুঁতভাবে কাজ করে এবং দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে।


আর এই সাধারণ ব্যাপারটাই সেইসব সফল মানুষদের আকর্ষণ করেছে। যাদের জীবনে প্রমাণের কিছু নেই, তারা শুধু সময়টা জানতে চান। মার্কেটিংয়ের চালাকি দিয়ে নয়, নিজেদের কাজের প্রমাণ দিয়েই ক্যাসিও কোটি মানুষের ভরসা অর্জন করেছে। যারা জীবনের আসল অর্থ বুঝেছেন, তাদের হাতে দামি ঘড়ির দরকার নেই।


আভিজাত্য আসলে দামি বস্তুতে নয়, বরং নিজের আত্মবিশ্বাসের মাঝেই লুকিয়ে থাকে।


© Touhidul Islam

No comments:

Post a Comment

১°C উষ্ণ পৃথিবীর অন্ধকার ভবিষ্যৎ: নেপালের বন্যা থেকে Zero-Emission বিপ্লব—মানবজাতির হাতে আর কত সময়?

 বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা মাত্র ১ ডিগ্রি বাড়লেই বাতাসের পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ে ৭ শতাংশ, নেপালের সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা কি আমাদেরই ডেকে ...