Zara Business Strategy: কীভাবে বিজ্ঞাপন ছাড়াই বিশ্বসেরা ব্র্যান্ড হলো জারা।

কখনো কি গভীরভাবে ভেবে দেখেছেন, তুমুল প্রতিযোগিতার বাজারেও পৃথিবীর অন্যতম বড় একটি ফ্যাশন ব্র্যান্ড কোনো বিজ্ঞাপন ছাড়াই কীভাবে বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে? আমরা কথা বলছি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলা ব্র্যান্ড জারা-এর কথা। 

সালটা ছিল ১৯৭৫। স্পেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সাদামাটা ছোট্ট একটি শহরে এক সাধারণ মানুষ কাপড়ের দোকান খুললেন। মানুষটির কোনো নামীদামি বিজনেস ডিগ্রি ছিল না। পেছনে টাকা ঢালার মতো কোনো ইনভেস্টর ছিল না, এমনকি ইন্ডাস্ট্রিতে তার কোনো চেনাজানাও ছিল না। তার নাম আমানসিও ওর্তেগা এবং সেই ছোট্ট দোকানটির নামই জারা। 

আজকের দিনে জারা একটি ১০০ বিলিয়ন ডলারের অবিশ্বাস্য সাম্রাজ্য। এই আকাশচুম্বী সাফল্যের পেছনে কোনো জাদুর কাঠি ছিল না। ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বাস্তবমুখী একটি ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ, যা তখনকার ফ্যাশন দুনিয়ার সমস্ত বাঁধাধরা নিয়মকানুনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছিল।

ওর্তেগা যখন ব্যবসা শুরু করেন, তখন ফ্যাশন দুনিয়ার কাজের ধরন ছিল অন্যরকম। বড় ডিজাইনাররা ঠিক করতেন সাধারণ মানুষ আগামীতে কী পরবে। তারা নিজেদের স্টুডিওতে বসে ডিজাইন তৈরি করে সেটা বাস্তবে রূপ দিয়ে দোকানে আনতে অন্তত বারো থেকে আঠারো মাস সময় নিতেন। এরপর সেই কাপড়ের প্রচারণার জন্য কোটি কোটি টাকা ঢালতেন বিজ্ঞাপনের পেছনে। তাদের লক্ষ্য ছিল ম্যাগাজিনে বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষকে বোঝানো যে, এটাই এখনকার লেটেস্ট ট্রেন্ড এবং তোমাদের এটাই কেনা উচিত। 

গুচি, প্রাডা থেকে শুরু করে লুই ভিতোঁ, সবাই একই নিয়মে ব্যবসা করত। কিন্তু ওর্তেগা পুরো সিস্টেমটাকে খুব কাছ থেকে দেখলেন। তার মনে হলো, এই সিস্টেমটার মধ্যে একটা মস্ত বড় গলদ আছে। তিনি নিজেকে এবং চারপাশের পরিবেশকে একটা যুগান্তকারী প্রশ্ন করে বসলেন। তিনি ভাবলেন, আমরা কেন মানুষকে জোর করে বলে দেবো তারা কী পরবে? এর চেয়ে বরং কাস্টমাররা আসলে ঠিক এই মুহূর্তে কী পরতে চায়, সেটা জেনে তাদের ঠিক সেই জিনিসটাই দিলে কেমন হয়? 

এই একটা মাত্র প্রশ্নই আজকের বিশ্বের সবচেয়ে দামি কোম্পানিগুলোর একটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।

এই চিন্তাধারা থেকে ওর্তেগা মূলত এমন তিনটি কাজ করলেন, যা ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির নিয়মগুলোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল। তার প্রথম চমকটি ছিল নিখুঁত হওয়ার চেয়ে কাজের গতির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া। যেখানে অন্যান্য ট্র্যাডিশনাল ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো একটি কাপড়ের ডিজাইন থেকে শুরু করে সেটা শোরুমে পৌঁছাতে বারো থেকে আঠারো মাস সময় নিত, সেখানে জারা পুরো কাজটা করত মাত্র পনেরো দিনে! 

একটু চিন্তা করে দেখুন বিষয়টা কতটা অবিশ্বাস্য। 

তারা হয়তো সোমবারে রাস্তায় কোনো নতুন ট্রেন্ড খেয়াল করল। সাথে সাথে মঙ্গলবারে সেটার ডিজাইন করে ফেলল। পরের সপ্তাহেই সেটা প্রডাকশনে চলে গেল এবং তার পরের সপ্তাহের মধ্যেই সেটা জারার শোরুমগুলোতে বিক্রির জন্য চলে এল। 

ব্যবসার ভাষায় এটাকে বলে প্রতিযোগীর সাইকেলে ঢুকে পড়া। যখন গুচির মতো ব্র্যান্ডগুলো তাদের আগামী বছরের কালেকশন নিয়ে মিটিংয়ে ব্যস্ত, জারা তখন মানুষ ঠিক এই মুহূর্তে যা চাইছে, ঠিক সেটাই তৈরি করে মুনাফা লুটে নিচ্ছে।

দ্বিতীয় যে কাজটিতে ওর্তেগা জোর দিলেন, সেটি হলো সহজলভ্যতার চেয়ে দুষ্প্রাপ্যতার ওপর ফোকাস করা। জারা যেহেতু খুব দ্রুত প্রডাকশন সাইকেল শেষ করত, তাই তারা সবকিছু খুব অল্প পরিমাণে বা ছোট ছোট ব্যাচে তৈরি করতে শুরু করল। এর মানে হলো, নির্দিষ্ট ডিজাইনের কাপড় একবার বিক্রি হয়ে গেলে তারা সাধারণত আর সেটা নতুন করে স্টকে আনে না। 

এই সাধারণ বিষয়টা কাস্টমারদের মনে অদ্ভুত এক তাগিদ বা ইমার্জেন্সি তৈরি করল। মানুষ খুব সহজেই বুঝতে পারল, আজ যে সুন্দর ড্রেসটা তারা জারার শো-রুমে দেখছে, কাল সেটা কিনতে এলে আর নাও থাকতে পারে। 

ফলে তারা বাধ্য হয়ে বারবার দোকানে ফিরে আসতে শুরু করল। অনেকেই সপ্তাহে দুবার করে জারার আউটলেটে ঢুঁ মারতে শুরু করল শুধু এটা নিশ্চিত করতে যে, তাদের পছন্দের কাপড়টা যেন কোনোভাবেই হাতছাড়া না হয়ে যায়। আর ঠিক এই কারণেই জারার কোনো বিজ্ঞাপনের দরকার পড়ে না। তাদের এই দুষ্প্রাপ্যতা বা স্কার্সিটিই হলো তাদের সবচেয়ে কার্যকর মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি।

জারার তৃতীয় কৌশলটি হলো, তারা নিজেদের কথা জোড় গলায় প্রচার করে না, বরং কাস্টমারদের কথা মন দিয়ে শোনে। প্রতিদিন জারার প্রতিটি স্টোর ম্যানেজার স্পেনের হেডকোয়ার্টারে রিপোর্ট পাঠান। এই রিপোর্ট শুধু কত টাকার বিক্রি হলো সেটার ওপর থাকে না। তারা মূলত জানায়, কাস্টমাররা আজ সারা দিন কী খুঁজছিল, ট্রায়াল রুমে কোন কাপড়গুলো পরে দেখছে, আর কোনগুলো নেড়েচেড়ে পছন্দ না হওয়ায় আবার র‍্যাকে রেখে দিচ্ছে। 

এই অমূল্য তথ্যগুলো সরাসরি চলে যায় জারার ডিজাইন টিমের কাছে। রিয়েল-টাইম ডেটা ব্যবহার করে তারা খুব সহজেই বোঝে বাজারে এখন ঠিক কিসের চাহিদা বেশি। এরপর তারা সেই অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়। অর্থাৎ, তারা কাস্টমারদের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেয় না, বরং কাস্টমাররা যা চায়, সেটাই বানিয়ে দেয়।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, জারার এই গল্পটা আপনার বা আমার জন্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? আপনি হয়তো একটি টেক কোম্পানি চালাচ্ছেন, অথবা আপনার হয়তো একটি রেস্টুরেন্ট আছে, কিংবা আপনি কনসাল্টিং ফার্ম গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন। বর্তমান আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যুগে আপনাকে এমন কিছু করতে হবে যা অন্যদের চেয়ে আপনাকে একেবারেই আলাদা করবে। মনে রাখবেন, বেশিরভাগ ব্যবসা এই কারণে নষ্ট হয়ে যায় না যে তাদের প্রোডাক্ট খুব খারাপ ছিল, বরং তারা ব্যর্থ হয় কারণ তারা খুব ধীরগতিতে কাজ করে। 

তাই দ্রুত কাজ শুরু করুন এবং আরো দ্রুত সামনে এগিয়ে যান। 

আপনার প্রোডাক্ট যদি সবসময় সবার জন্য সহজলভ্য থাকে, তবে তার প্রতি মানুষের আকর্ষণ কমে যায়। তাই সেটার মধ্যে এক ধরনের এক্সক্লুসিভ ব্যাপার নিয়ে আসুন। আর সবচেয়ে বড় কথা, আপনার কাস্টমারদের কথা শুনুন। কারণ আপনার স্ট্র্যাটেজি টিমের চেয়ে আপনার কাস্টমাররাই সবচেয়ে ভালো জানে আপনার প্রোডাক্ট কেমন হওয়া উচিত। জীবনে সফল হতে গেলে বিশাল কোনো বাজেট বা মিলিয়ন ফলোয়ারের দরকার নেই। আপনার শুধু দরকার কাস্টমারের কাছাকাছি থাকা এবং সবার চেয়ে দ্রুত কাজ করা।

No comments:

Post a Comment

Zara Business Strategy: কীভাবে বিজ্ঞাপন ছাড়াই বিশ্বসেরা ব্র্যান্ড হলো জারা।

কখনো কি গভীরভাবে ভেবে দেখেছেন, তুমুল প্রতিযোগিতার বাজারেও পৃথিবীর অন্যতম বড় একটি ফ্যাশন ব্র্যান্ড কোনো বিজ্ঞাপন ছাড়াই কীভাবে বিলিয়ন ডলারের স...